1. marufhassain@gmail.com : admin :

September 25, 2021, 7:01 am

শিরোনামঃ
বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই কৃষিতে বিস্ময়কর সাফল্য এসেছে-কৃষিমন্ত্রী রাজশাহীতে বেড়েছে পাট চাষ ঝালকাঠিতে কাজি পেয়ারার বাম্পার ফলন এফবিসিসিআইয়ের ম্যাধ্যমে আপনাদের কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, সেগুলো জানাবেন। আমরা সেগুলো সুপারিশ করব।’-কৃষিমন্ত্রী পদ্মার চরে কলা চাষে চমকে দিলেন ইউনিয়ন চেয়ারম্যান দেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল: কৃষিমন্ত্রী কৃষিকে লাভজনক করতে কৃষিবান্ধব নীতি বাস্তবায়ন করছে সরকার-কৃষিমন্ত্রী কৃষি মন্ত্রণালয়ের এডিপি বাস্তবায়ন হার ৯৮ শতাংশ উন্নয়নশীল দেশের খাদ্যচক্রে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব: কৃষিমন্ত্রী বাড়ছে ছাদ বাগান ও ছাদ কৃষির আগ্রহ
কৃষি ক্ষেত্রে আজকের সাফল্যের ভিত্তিটা তৈরি হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর হাতে

কৃষি ক্ষেত্রে আজকের সাফল্যের ভিত্তিটা তৈরি হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর হাতে

অগ্রগতির যাত্রায় আমরা আজকে অনেকদূর পেরিয়ে এসেছি। কৃষি ক্ষেত্রে উত্পাদন বৃদ্ধি ও বৈচিত্রায়নে আমাদের সাফল্য গর্ব করার মতো। খাদ্যশস্য উত্পাদন এখন পৌঁছেছে তিন কোটি আশি লক্ষ টনে, ১৯৭২ সনে যা ছিল প্রায় এক কোটি মেট্রিক টন। মাছ উত্পাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে চতুর্থ। গোল আলু উত্পাদনে বিশ্বে সপ্তম এবং আগে শাক-সবজির উত্পাদন শীত মৌসুমে ব্যাপ্ত ছিল (মোট উত্পাদনের ৭০ শতাংশ) যা এখন বছরব্যাপী প্রসারিত হয়েছে। পোল্ট্রি ও ডিম ১৬ কোটি মানুষের চাহিদা মিটাচ্ছে। ১২শ কোটি পিস এখন আমাদের বার্ষিক ডিম উত্পাদন। কলা চাষে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ। বিখ্যাত দার্শনিক রুশো বলেছিলেন, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও গৌরবমণ্ডিত শিল্প হচ্ছে কৃষি’। গ্রাম-বাংলার শাশ্বত প্রকৃতির কোলে লালিত, বড় হয়ে উঠা এবং কৃষক, মজুর, মেহনতি জনমানুষের সংস্পর্শে রাজনীতির চিন্তা চেতনার বিকাশ পর্যায়ে ক্রমান্বয়ে শতাব্দীর মহানায়ক বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেছিলেন অত্যন্ত দূরদর্শী ও বিজ্ঞানমনস্ক। হয়ে উঠেছিলেন ঔপনিবেশিক জাঁতাকলে শোষিত, পিষ্ট মানুষের মুক্তির অবতার। নেতৃত্বের সফল পরিণতিতে একাত্তরে রচনা করতে পেরেছিলেন বাঙালির চির আরাধ্য মুক্তি সংগ্রামের মহাকাব্য।
ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত, দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম, এক কোটি লোকের সহায়-সম্পত্তি হারিয়ে দেশান্তর যাত্রা, তাণ্ডবলীলায় বিধ্বস্ত অর্থনীতির ধ্বংসস্তূপে রূপকথার ফিনিক্স পাখির পুনর্জন্মের মতোই আমাদের বিজয় অর্জিত হয় ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সনে। রচিত হয় হাজার বছরের শোষণ বঞ্চনায় জর্জরিত বাঙালি জাতির বিজয়গাথা। ১৯৭২ সনের ১০ জানুয়ারি শতাব্দীর মহানায়ক বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরেন বিজয়ীর বেশে। নতুন রাষ্ট্রের জন্ম, সর্বত্রই ধ্বংসযজ্ঞের বিশৃঙ্খল স্তূপ। রাষ্ট্র ভাণ্ডারশূন্য। নামেমাত্র যে শিল্প কারখানা ছিল, পাকিস্তানিরা ফেলে পালিয়েছে, সশস্ত্র যুদ্ধের ৯ মাসে সবই ধ্বংসপ্রাপ্ত, মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় কিংবা তাঁদের ছেলেরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ায়— গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। একাত্তরের শেষে তেমন ফসল-ফলাদি ঘরে তোলা যায়নি। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলে, সব বয়সী মুক্তিযোদ্ধা, তাদের সহায়তাদানকারীরা বিজয়ীর বেশে ঘরে ফেরেন। লক্ষ অস্ত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে যত্রতত্র। রাস্তা-সড়ক জনপথ, ব্রিজ কালভার্ট জনযুদ্ধের কৌশলে সবই ধ্বংস করা হয়েছিল। স্বাধীনতা অর্জনের পর দেখা দিল প্রশাসন ব্যবস্থা দাঁড় করানোর অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জ। দু-তিনটি দেশ ছাড়া নতুন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি মেলেনি তখনো। বাণিজ্য অবকাঠামো নেই। কী দুঃসহ শূন্যতায় বঙ্গবন্ধুর সরকার যাত্রা শুরু করেছিলেন, সে কথা ভাবলে মনে হয় দূরতিক্রম্য হিমালয় পর্বতমালা পেরিয়ে যাওয়াও বোধ হয় এর চেয়ে সহজতর ছিল। সেই কঠিন সত্যকে উপলব্ধি না করে, স্বাধীনতা উত্তরকালে কিছু বাম রাজনৈতিক দলের উগ্রতা এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েও কোনো কোনো গোষ্ঠীর সব কিছু দখলে নেওয়ার উদগ্র বাসনা, পরিস্থিতিকে কেবল জটিলতরই করে তুলেছিল। সেই চ্যালেঞ্জের দিনগুলোতে বঙ্গবন্ধুর দূরদৃষ্টি, মহানুভবতা, প্রজ্ঞা এবং অন্তর্দৃষ্টি, বিশেষভাবে দ্রুত প্রশাসন কাঠামো দাঁড় করানো, মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহূত অস্ত্রগুলো রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে নেওয়া, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য সফল কূটনীতি পরিচালনা করা, সংবিধান প্রণয়নে এগিয়ে যাওয়া, অর্থনীতি পুনর্গঠনে সর্বশক্তি নিয়োগ করা, দ্রুত সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালনায় গণমুখী আইন প্রণয়ন (১৯৭৪), দেশে ফেরার ১৮ দিনের মাথায় পরিকল্পনা কমিশন প্রতিষ্ঠা করা, প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে রাষ্টীয়করণ করা, একটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন সম্পন্ন করা; মাত্র সাড়ে তিন বছর সময়ে এটা কখনোই সম্ভব হতো না বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে। আমি মনে করি এত অল্প সময়ে এত সাফল্য বিশ্বে নজিরবিহীন। বিস্তারিত কর্মকাণ্ড এই নিবন্ধের পরিসরে বর্ণনা সম্ভব নয়। এই স্বল্প সময়ে কৃষি ক্ষেত্রে (যা অর্থনীতির তখন ৯০ শতাংশ) বঙ্গবন্ধু যে ঐতিহাসিক দূরদর্শী পদক্ষেপগুলো নিয়েছিলেন প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা সৃষ্টিতে, যার ফলশ্রুতিতে ক্রমান্বয়ে কৃষি আজকে একটা পরম সাফল্যের পর্যায়ে পৌঁছেছে, সে পদক্ষেপগুলোই বর্ণনা করতে চাই সংক্ষেপে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাকিস্তান কাঁচামাল সরবরাহ বন্ধ করে দিলে স্থানীয়ভাবে তুলার উত্পাদনের গুরুত্ব অনুভূত হয়েছিল। এসময় আমাদের বস্ত্র শিল্পগুলো কাঁচামালের অভাবে মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন  হয়েছিল। এই অবস্থায় ১৯৭২ সালে দেশে তুলার চাষ সম্প্রসারণ করার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে তুলা উন্নয়ন বোর্ড গঠিত হয়। তুলা উন্নয়ন বোর্ড ১৯৭৪-৭৫ সালে মাঠ পর্যায়ে আমেরিকান আপল্যান্ড তুলা দিয়ে পরীক্ষামূলক তুলার চাষ শুরু করে।
বঙ্গবন্ধু আজীবন সংগ্রাম করেছেন এদেশের শোষিত, বঞ্চিত নিরন্ন কৃষকের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। তিনি ছিলেন রাজনীতির চারণ কবি। রাজনীতিক হয়ে উঠেছিলেন গ্রাম-বাংলার ফসলের ক্ষেতের আইল মাড়িয়ে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন অর্থনৈতিকভাবে উন্নত ও সমৃদ্ধ একটি সোনার বাংলা গড়তে কৃষি শিল্পের উন্নয়ন অপরিহার্য। তাই তো ১৯৭৩ সনেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, কৃষিতে গবেষণা সমন্বয়ের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান, এটি গঠনের দায়িত্ব প্রদান করেন স্বনামখ্যাত কৃষিবিদ ড. কাজী বদরুদ্দোজাকে। ১৯৭২ সালে নতুন নামে পুনর্গঠন ও বিস্তৃতি ঘটান ধান গবেষণা ইন্সটিটিউটের। তখনই ঢাকার আণবিক গবেষণা কেন্দ্রে ‘কৃষি পারমাণবিক গবেষণা ইন্সটিটিউট অব নিউক্লিয়ার এগ্রিকালচার (ইনা)’ প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশ দেন, যা ১৯৭৫ সালের গোড়ার দিকে বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব নিউক্লিয়ার এগ্রিকালচার (বিনা) হিসেবে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে স্থানান্তরিত হয়। কৃষি গবেষণার ক্ষেত্রে বারি (BARI) , বিরি (BRRI), বিনা (BINA) এসবের অবদান সর্বজনের জানা রয়েছে। বঙ্গবন্ধু কৃষি সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বীজ ও সার সরবরাহের প্রতিষ্ঠান বিএডিসিকে পুনর্গঠন এবং সারাদেশে এর বীজ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন ১৯৭৫ সালে। এই বিএডিসিই আধুনিক কৃষি সেচ ব্যবস্থার প্রচলন করে এদেশে। ইরি বীজ সরবরাহে এই প্রতিষ্ঠান একক এবং উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। স্বাধীনতার পর ‘জুট অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে প্রাক্তন জুট এগ্রিকালচার রিসার্চ ল্যাবরেটরিকে জুট রিসার্চ ইন্সটিটিউট নামে পুনর্গঠন করা হয়।
কৃষি শিক্ষাকে আধুনিকায়ন ও সময়োপযোগী করার বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর একাগ্রতা ও মমত্ববোধের পরিচয় অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে অতীত ও অনাগত কৃষি গ্রাজুয়েটদের অন্তরে। ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে আসেন। শত ব্যস্ততার মাঝেও কৃষক ও কৃষি শিক্ষাকে উদ্দীপনা প্রদানে ছুটে আসেন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ শ্যামল আঙিনায়। কৃষক-কৃষাণি ও কৃষিবিদদের সঙ্গে তাঁর আত্মার সম্পর্ক তিনি প্রতিধ্বনিত করেছিলেন সে দিনের ছাত্র-জনতার বিশাল সমাবেশে। তিনি বলেছিলেন, “বাংলার মাটির মতো মাটি দুনিয়ায় দেখা যায় না। বাংলার মানুষের মতো মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না। বাংলার সম্পদের মতো সম্পদ দুনিয়ায় পাওয়া যায় না”। …“গ্রামে যেয়ে আমার চাষী ভাইদের সাথে প্রাকটিকেল কাজ শিখতে হবে। …অনেক আগে কৃষি বিপ্লবের কথা বলেছি। ৫০০ কোটি টাকার ডেভেলপমেন্ট বাজেট করেছিলাম এবং ১০১ কোটি টাকা কৃষি উন্নয়নের জন্য দিয়েছি। ভিক্ষা করে আমি টাকা জোগাড় করেছি”। প্রাণের ছোঁয়ায়, প্রাঞ্জলভাবে তিনি কথাগুলো বলে কৃষি শিক্ষার্থীদের উজ্জীবিত করেছেন সেদিন। ঊনসত্তুরের গণআন্দোলনে ছাত্রদের ১১ দফার অন্যতম দাবি ছিল— ডাক্তার, প্রকৌশলীদের মতো কৃষি গ্রাজুয়েটদের সমমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে ছাত্র-জনতার সমাবেশে তিনি ডাক্তার, প্রকৌশলী ও কৃষিবিদদের জন্য ক্যাডার সার্ভিস ও বেতন-ভাতার ক্ষেত্রে সমমর্যাদার ঘোষণা দেন এবং তা কার্যকর করেন। সে দিন থেকেই কৃষি শিক্ষা একটি সম্মানজনক শিক্ষা ও পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই কৃষি বিজ্ঞানীরা দেশের প্রতিষ্ঠিত কৃষি গবেষণা কেন্দ্রগুলোতে কৃষি প্রযুক্তি, ফসলের জাত উন্নয়ন, জলবায়ুর অভিঘাত সহনশীল জাত উদ্ভাবনসহ কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তনে প্রতিনিয়ত গবেষণায় ব্যাপৃত রয়েছেন। আজকের কৃষি ক্ষেত্রে যে বৈচিত্র্যময় সাফল্য, বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা দানে সক্ষমতা এবং আগামী দিনের জলবায়ুর অভিঘাত ও বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য সরবরাহের চ্যালেঞ্জ গ্রহণের সামর্থ্য, সেই ভিত্তিটাই বঙ্গবন্ধু নিষ্ঠা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে কৃষকের প্রতি অন্তরতম মমত্বে স্থাপন করে গিয়েছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁর স্বল্পতম শাসনকালে।
n লেখক: প্রফেসর (অবসরপ্রাপ্ত), বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও কৃষি অর্থনীতিবিদ

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




Design & Developed BY Md. Maruf Hossain